নিজেকেই খুজছি…ঐন্দ্রিলা দত্ত  ID: 11201191

 

সবেমাত্র হাতেখড়ি নিলাম আমি, বয়স চার পাঁচেক হবে। অত-শত কিছুই এখন তেমন স্পষ্ট মনে নেই। আশেপাশের খেলার জগত অন্যান্যদের মত তেমন বিস্তৃত ছিল না। যা দিন কাটত ঘরে বসে কাটত। সারাদিন পড়ালেখার  ফাঁকে ফাঁকে কত আজেবাজে চিন্তা আসত… কতই না বিশাল ছিল আমার চিন্তার জগত!! এখন আমরা যাদেরকে ‘ফিলসফার’ বলি আর কি।বয়স কম ছিল তাই উপাধিটা জুটল না। ভাগ্যিস !! আমার সেই চিন্তার পরিধি মস্তিস্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। না হয় কত বকুনিই না খেতে হত কি জানি। বরাবরই আমি পড়ালেখার প্রতি যত্নশীল ছিলাম। সঠিক করে বলতে পারছি না। সেটা আমার যত্নশীলতা ছিল, নাকি বাড়ির বকুনির ভয়ে ছিল? যাক, সেই পড়ালেখার প্রতি যত্নশীল হতে গিয়ে চিন্তার পরিধি ক্রমশ কমিয়ে আনতে হয়েছিল।“সারাদিন পড়ার টেবিলে বসে থাক আর পরীক্ষায় প্রথম স্থান টিকিয়ে রাখ।“ এই ছিল পরিবারের কঠিনতম নির্দেশ। গৎবাঁধা আট দশটা ছাত্র-ছাত্রী ঐ বয়সে থাকতে যাই করত আমিও নির্দ্বিধায় বাবা- মার স্বপ্ন পূরনে মিলিয়ে গেলাম।কিন্তু ভিতরের সত্যিকারের আমিটাকে আর বেধে রাখা যায় না।তখন সারাদিন মাথায় ঘুরত মহাকাশ-পৃথিবী-গ্রহ-নক্ষত্র এসব। সে সময়ত আর ইন্টারনেট সহজলভ্য ছিল না। সব কিছুর একটা নিজের মত ব্যাখ্যা দাড় করানোর চেষ্টা করতাম। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম সেইদিন যেদিন শুনলাম আমরা পৃথিবীর ভিতরে নই বাইরের আবরন টুকুর উপর বাস করি। মা-ই প্রথম আমাকে শুধরে দিয়েছিলেন। বলতে গেলে মায়ের হাত ধরেই আমার প্রথম ফিজিক্স শেখা। তখনি চারপাশ থেকে হাজার প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক শুরু করে দিল। কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর না করেই ভাবতে শুরু করে দিলাম।বিজ্ঞানীদের মত কিছু একটা করে ফেলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ভাবিয়ে রাখত সবসময়। আবছা আবছা মনে আছে। একবার বাড়িতে কারেন্টের শর্টসার্কিট করে ফেলেছিলাম।তখন বোধহয় ক্লাস সিক্সে পড়ি। অনেকগুলো লাইট ফেটে গিয়েছিল সেইদিন। ঘটনাটাতে এত্ত ভয় পেয়েছিলাম সে কি বলব! বাড়িতে জানতেই দেইনি যে এটা কিভাবে আমি করেছি। অবশ্য তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাকে কিছুই বলেন নি। আজ বুঝি প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে মা-বাবার সাপোর্ট কতটুকু প্রয়োজন। আমার এসব পাগলামি কাজে তারা কখনো বাধা দেন নি, বরং উৎসাহ দিতেন। কেন হয়েছে কিভাবে হয়েছে সবসময়ই বন্ধুর মত বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাদের একটাই আবদার ছিল, প্রথম স্থান যাতে না হারাই। যারা আমার জন্য এত কিছু করেন আমি কি তাদের জন্য এতটুকুও করতে পারব না?? তাই অন্য সব চিন্তা যেগুলো মাথায় উঁকি দিত তাদের জোর করেই আস্তে মানা করে দিলাম। অবশেষে সেই বিশেষ প্রতিক্ষীত ক্ষন উপস্থিত হল। সবেমাত্র তখন নবম শ্রেনীতে পা দিলাম। পরিবারের সবার ইচ্ছা আমাকে নাম করা ডাক্তার বানাবে। তাই অবশ্যই সায়েন্স নিতে হবে। আমি তখনো সায়েন্স, আর্টস , কমার্স এগুলোর মধ্যে পার্থক্য কোথায় তাই বুঝতাম না। আমার মা একজন বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় তার মাধ্যমে physics, chemistry, biology নামগুলি এবং ছোটখাট  basic knowledge গুলো রপ্ত করা শিখি।কিন্তু একি!! যখন স্কুলে গেলাম… ফিজিক্সের ম্যাডামকে দেখেতো আমার হার্টটা চুপসে গেল, আমার সামনে যমদূত এসে দাড়াঁলেও মনে হয় আমি এতটুকু ভয় পেতাম না। যতটুকু না ফিজিক্সের ম্যাডামকে দেখে ভয় পেতাম। তাঁর সামনে গেলেই আমি আমার দ্রুত  হৃদপিণ্ডের ধুকধুক আওয়াজ শুনতে পেতাম। আর হাটু দু’টির কম্পন মনে হয় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির চেয়েও বেশি থাকত। যথারীতি বাড়িতে ফিরে কান্নাকাটি। আমি কিছুই বুঝি না। কিছুই বুঝি না… এরপর বাড়িতে একজন শিক্ষক এসে আমাকে সপ্তাহে তিনদিন করে বিজ্ঞান বুঝিয়ে যেতেন। যথারীতি বিজ্ঞানের ছাত্রী হলাম…… এখনো আছি। তবে সেই আমি আর এই আমির মধ্যে অনেক পার্থক্য। এখন আমার শিক্ষার মূল উপকরন পুথিঁগত বিদ্যা নয়, এখন আমার জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে নেওয়ার মূল হাতিয়ার করেছি আমার আশেপাশের পরিবেশ। যেটা আমার কমপক্ষে আট দশ বছর আগে করা উচিত ছিল।জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আমি আমার সত্যিকারের যে আমিকে অনেক আগেই নিজের হাতে গলা টিপে খুন করেছিলাম, সেই আমি’টার আত্মাকে যদি আজ এতটুকুও শান্তি দিতে পারি তাহলে দু চারটা ইয়ার ক্লাস সহজেই হজম করে নেওয়া যায়। আজ বুঝি শিক্ষিত হওয়া আর জ্ঞান আহরণ করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। আমরা সবাই শিক্ষিত হতে জানি, কিন্তু এতটুকুর জন্যও ভেবে দেখি না সেই শিক্ষা ভবিষ্যতে কি দেয়?? সব সময়ই ভাবি…… নিউটন স্যার আইন্স্টাইন স্যার কোন রাইটারের বই ফলো করতেন?? যদি উনারা কোনো বই ফলো না করতেন তাহলে কি উনারা শিক্ষিত ছিলেন না??শিক্ষিত হওয়া মানে কি, মস্তিস্ককে নিজের মত ভাবতে না দেয়া??

আমি চাই…… আমি আরও জানতে চাই। প্রকৃতির মধ্যে এমন কি ছিল বা আছে যা আমি বুঝি না ? আমি সেই Equation সলভ্‌ করতে চাই। ছুতেঁ চাই সেই সাত রংকে, বুঝতে চাই তার কাব্যিক ভাষা, সুর, গান। আমার মস্তিস্কের নিউরন সেলগুলো যদিও খুব কম কাজ করে, তাও আমাদের এই প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্যের ভেদ করতে চাই। শুধুই জানার নিমিত্তে…

প্রকৃতি তার জ্ঞানের ভান্ডার আমাদের জানার জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছে, কিন্তু আমরা আমাদের জৈবিক চাহিদা পূরনের লক্ষ্যে জ্ঞান চক্ষু বন্ধ করে রেখেছি। এই বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের রাজ্যে আমি রিক্ত হস্তে নিজের ভুল শুধরানোর রাস্তা খুজঁছি। জানি রাস্তাটা আমার জন্যে এবড়ো থেবড়ো, তবুও আমি আমার রক্তের শেষ বিন্দুর আগের বিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব। আর শেষ বিন্দুটা রেখে যাব আগের গুলোকে বিশ্লেষন করার জন্য।

 

Categories: e-magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published.